মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

বার্ড ফ্লু প্রতিরোধের পরামর্শ

ব্লার্ড ফ্লু আতঙ্কে পড়েছে পোলট্রি শিল্প। দেশের বিভিন্ন স্থানে খামারিরা এ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। এ জন্য বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে অনেকে দ্রুত মুরগি বিক্রি করা সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। বিক্রি করছেন কেউ কেউ। ফলে এত দিন খামারে এক শ’ টাকার বেশি দামে প্রতি কেজি মুরগি বিক্রি হলেও এখন তা নেমে এসেছে ৮০ টাকারও নিচে। আতঙ্কের কারণ হিসেবে খামারিরা ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতা ও সরকারিভাবে ওই কার্যক্রম সমপ্রসারিত না করাকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, বার্ড-ফ্লু সংক্রমণ থেকে পোলট্রি সেক্টরকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ভ্যাকসিন কার্যক্রম সমপ্রসারিত করার বিকল্প নেই। কিন্তু সরকারি পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত কোন পরিকল্পনা নেই। এমনকি পরীক্ষামূলকভাবে যে ভ্যাকসিন এনেছিল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, তা-ও আর অবশিষ্ট নেই। ফলে চলতি শীত মওসুমে দেশ বার্ড-ফ্লু প্রকোপের মধ্যে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি পোলট্রি শিল্পে বিনিয়োগকারীদের। প্রাণিসমপদ অধিদপ্তর এ বিষয়ে গুরুত্বআরোপ করলেও ভ্যাকসিন আমদানির ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছে।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। সেই আলোকে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় নির্দেশনা না দিলে অধিদপ্তর এ নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি সেখানেও।
পোলট্রি খাতে বিনিয়োগকারী, কৃষিবিষয়ক পত্রিকা আধুনিক কৃষিখামার-এর পাবলিকেশন কো-অর্ডিনেটর কৃষিবিদ সৈয়দ মেহদী আশরাফ বলেন, পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনে উপকার পেয়েছিল খামারিরা। এতে আশান্বিত হয়েছিলেন তারা। কিন্তু কেন যে এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিন নিয়ে সমপ্রসারিত কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হলো না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইসিডিআর-এর এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন আনার পর এ নিয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিনা- তা তাদেরও জানানো হয়নি।
খামারিরা জানান, শীত মওসুমে বাংলাদেশে বার্ড-ফ্লু’র সংক্রমণ ঘটে বেশি। ২০০৬ সালে প্রথম এ ফ্লু’র সংক্রমণের শিকার হয় দেশটি। তখন খামারির সংখ্যা ছিল দেড় লাখেরও বেশি। ২০০৭ ও ২০০৯ সালে দেশে অত্যন্ত ব্যাপক হারে ফ্লু’র সংক্রমণ ঘটে দেশে। এর ফলে কয়েক হাজার বিনিয়োগকারী ও খামারি সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেন। একসঙ্গে তখন বন্ধ হয়ে যায় কয়েক হাজার পোলট্রি খামার। ঋণখেলাপি হন তাদের অনেকেই। এতে দেশের পোলট্রি শিল্প পড়ে মারাত্মক হুমকির মুখে। অব্যাহত থাকে লোকসানের বিষয়টি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ বছরে বিনিয়োগের হার নেমে আসে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। অন্তত ১ লাখ বিনিয়োগকারী ও খামারি এ শিল্প ছেড়ে দেন। এ সময় বিনিয়োগকারীরা শিল্পটিকে বাঁচাতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। তারা বার্ড-ফ্লু প্রতিরোধে নতুন ভ্যাকসিন আনার তৎপরতা নিতে আহ্বান জানান। এরই কল্যাণে সরকার ২০১২ সালে ভ্যাকসিন আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম অবস্থায় পরীক্ষামূলক আনা এবং প্রয়োগটি কার্যকারিতা পেলে তা দেশব্যাপী সমপ্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে ভ্যাকসিন আনা হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে ৩টি কোম্পানির মাধ্যমে সীমিত পরিমাণে এ ভ্যাকসিন আমদানি করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে গাজীপুর ও কিশোরগঞ্জে পরীক্ষামূলক এ কার্যক্রম চালানো হয়। সেখানকার ব্রিডার ফার্ম ও কিছু লেয়ার ফার্মে এগুলো প্রয়োগ করা হয়। এতে সুফলও পাওয়া যায়। এ প্রকল্পের কারণে ওই অঞ্চলগুলোতে সে সময় বার্ড-ফ্লু আক্রান্তের কোন খবর পাওয়া যায়নি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা গ্রহণযোগ্য হলে ভ্যাকসিন আমদানির কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার এ নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি। অথচ ওই অঞ্চলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা দেখে খামারি ও বিনিয়োগকারীরা নতুন করে এ শিল্প নিয়ে আশান্বিত হয়েছিলেন। খামারিরা জানান, সরকারের কাছে এ মুহূর্তে আমদানি করা ভ্যাকসিনও নেই। এ জন্য কোন মুহূর্তে যদি ফ্লু সংক্রমণ দেখা দেয় তাহলে তা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যাবে। সূত্র জানায়, ভ্যাকসিন আনতে হলে ওষুধ প্রশাসনের নিবন্ধন লাগবে। তবে এর জন্য কোন উদ্যোগও এখন পর্যন্ত নেয়া হয়নি। ইতিমধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ওই ভ্যাকসিন প্রয়োগ হচ্ছে এবং এর ফলাফল হিসেবে সেসব দেশে ফ্লুর প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। খামারিদের মতে, দেশের পোলট্রি শিল্পের স্বার্থেই ভ্যাকসিন আনা প্রয়োজন। তবে তা অবশ্যই ভাল ব্র্যান্ডের এবং প্রকৃত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি আনতে হবে।

 

এ সময় বার্ড ফ্লু (এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা) দেখা দিতে পারে। এটি ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ। এর জীবাণু বার্ড ফ্লু আক্রান্ত হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য পাখির মল, রক্ত ও শ্বাসনালীতে বাস করে। মানুষ ঘটনাচক্রে এ রোগে আক্রান্ত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সংক্রমণই ঘটেছে তাদের যারা আক্রান্ত পাখি জবাই বা পালক ছাড়ানোর জন্য নাড়াচাড়া করেছে। আবার যেসব শিশু আক্রান্ত পাখি বা মৃত হাঁস-মুরগি নিয়ে খেলা করে তাদেরও এ রোগ হতে পারে। এ রোগটি সাধারণত শুরু হয় জ্বর-সর্দি-কাশির মাধ্যমে এবং পরে তা মারাত্মক নিউমোনিয়ার রূপ ধারণ করে, যার পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু।

১. খালি হাতে অসুস্থ বা অস্বাভাবিকভাবে মৃত হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য পাখি ধরাছোঁয়া ও নাড়াচাড়া করা যাবে না।

২. বাড়িতে রোগে আক্রান্ত হাঁস-মুরগি জবাই করা বা পালক ছাড়ানো অথবা নাড়াচাড়া করা যাবে না।

৩. রোগে আক্রান্ত হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য পাখি ধরাছোঁয়া ও সেগুলো নিয়ে খেলাধুলা করা থেকে শিশুদের বিরত রাখতে হবে।

৪. হাঁস-মুরগি বা পশুপাখি ধরাছোঁয়ার পর ভালো করে সাবান বা ছাই এবং পানি দিয়ে দুই হাত পরিষ্কার করে ধুতে হবে।

৫. হাঁস-মুরগি বা পশুপাখি দেখাশোনা করার সময় কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নিতে হবে। পশুপাখি নাড়াচাড়ার পর সে হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখে লাগানো যাবে না।

৬. হাঁস-মুরগির মাংস ভালোভাবে রান্না করতে হবে। আধা সেদ্ধ মাংস, ডিম বা মাংসের তৈরি খাবার খাওয়া যাবে না।

৭. বার্ড ফ্লু রোগ ছড়িয়ে পড়েছে এমন স্থানে বা তার আশপাশে যারা বসবাস করে, তাদের জীবন্ত হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য পাখি ক্রয়-বিক্রয় বা জবাই করার স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

৮. রোগে আক্রান্ত হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য পাখির মল সার অথবা মাছের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে না।

৯. যদি কোথাও হঠাত্ হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য পাখি অস্বাভাবিক হারে মারা যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ড কমিশনার অথবা উপজেলা পশুসম্পদ দফতরে জানাতে হবে। মৃত হাঁস-মুরগি এবং পাখি মাটিতে পুঁতে ফেলার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

১০. হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য পাখি ধরাছোঁয়ার পর যদি কেউ জ্বর-সর্দি-কাশি জাতীয় কোনো রোগে ভোগেন তবে তাড়াতাড়ি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র/হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য যেতে হবে। রোগে আক্রান্ত বা মৃত হাঁস-মুরগির সংস্পর্শে আসার বিষয়টিও তাদের জানাতে হবে।